বৃত্তি পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া: বৈষম্য নাকি নীতিগত সংকট?

 


২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাতিলের সিদ্ধান্তে দেশের শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক পরিপত্রের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তাদের সংলগ্ন কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই এবার বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। এতে লাখ লাখ কেজি স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা বাইরে থেকে যাচ্ছে, যাদের মধ্যে রয়েছে বহু মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিশু।

---

এই সিদ্ধান্ত কি কেবল প্রশাসনিক?


না, এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি শিক্ষানীতিগত বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

বিভিন্ন শহর ও উপজেলা পর্যায়ে, সরকারি বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের কিন্ডারগার্টেনে পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তু এখন সেই শিশুদেরকে শুধুমাত্র স্কুলের ধরন ভিন্ন হওয়ায় বৃত্তি পরীক্ষার মতো জাতীয় মেধা যাচাইয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ‘সবার জন্য শিক্ষা’ ও শিশু অধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

---

📊 প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা:


দেশে বর্তমানে ৬০ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।


কিন্ডারগার্টেন ব্যবস্থা শুধু একটি শিক্ষা বিকল্প নয়, এটি সরকারি ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণের একটি পরিপূরক অবকাঠামো।


এসব প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, এবং দেশের শিক্ষা কাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।

---

📌 সিদ্ধান্তের বিভ্রান্তি ও দ্বৈততা:

এই সিদ্ধান্তের আগে কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সচিবালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয় এবং অংশগ্রহণের আশ্বাসও পাওয়া যায়। অথচ কিছুদিন পরেই উল্টো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে সমন্বয়হীনতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির দ্বৈততা প্রকাশ করে। এতে সরকার ও সাধারণ মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসে চিড় ধরতে পারে।

---

⚖️ কেন এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ?


1. শিক্ষার অধিকার সবার—শিশুর স্কুলের ধরন সেই অধিকার বাতিল করতে পারে না।

2. নিবন্ধিত কিন্ডারগার্টেনগুলোকেও বাদ দেওয়া আইন ও ন্যায়ের পরিপন্থী।

3. যখন নন-এমপিও স্কুলের শিক্ষার্থী SSC পরীক্ষা দিতে পারে, তখন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থী বঞ্চিত কেন?

4. সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদিত কিন্ডারগার্টেনকে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

---

🧒 শিশুদের অধিকার কে রক্ষা করবে?

শিশুদের শিক্ষা ও সম্ভাবনার বিকাশে বৃত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। লাখো শিশু এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই দায়িত্ববান রাষ্ট্রের কাজ নয়। বরং এটি একধরনের বৈষম্যকে আইনি রূপ দেওয়ার নামান্তর।

---

আমাদের প্রস্তাবনা:

1. চলতি বছরের বৃত্তি পরীক্ষায় অবিলম্বে নিবন্ধিত কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন।

2. আগামী এক বছরের মধ্যে সব কিন্ডারগার্টেনকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণে বাধ্য করুন।

3. ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নীতির আলোকে এমন বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত বাতিল করুন।

---

📣 শেষ কথা:

শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রত্যেক শিশুর জন্মগত অধিকার। কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকার যদি সকল শিশুর প্রতি সমান দৃষ্টি দেয়, তবে তবেই রাষ্ট্র ‘সবার জন্য শিক্ষা’র অঙ্গীকারে সত্যিকারের অগ্রসর হতে পারবে।

---

✍️ লেখক:

মোহাম্মদ আলী

সহকারী প্রধান শিক্ষক | শিক্ষা পর্যবেক্ষক

📧 ইমেইল: mali2094138@gmail.com

---

📌 আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন

🔁 শেয়ার করুন যাতে শিশুদের অধিকার রক্ষা হয়


Comments

  1. ভালো সিদ্ধান্ত

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

"শিক্ষকরা কি অতিরিক্ত ভাতা নিতে পারবেন? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে যা বলা হয়েছে"

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সরাসরি আবেদন নিষিদ্ধ: মাঠপর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য নতুন নির্দেশনা

এমপিও শিক্ষকের ১ম উচ্চতর স্কেল যোগদান থেকে নাকি বিএড স্কেল থেকে হিসাব হবে ? নীতিমালা ২০২১ বনাম ২০১৮